নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সময় লেগেছে ২২ মিনিট, কী বলছেন সমালোচকেরা


প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ২, ২০২৪, ৩:৪০ অপরাহ্ন / ৪৪
নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সময় লেগেছে ২২ মিনিট, কী বলছেন সমালোচকেরা
গত বৃহস্পতিবার আলাবামা অঙ্গরাজ্যের হোলম্যান কারাগারে নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে যে আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাঁর নাম কেনেথ স্মিথছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত তিনটি অঙ্গরাজ্যে নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতিটি অনুমোদন পেয়েছে। তিনটি অঙ্গরাজ্য হলো—আলাবামা, ওকলাহোমা ও মিসিসিপি। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার আলাবামা অঙ্গরাজ্যের হোলম্যান কারাগারে প্রথমবারের মতো নাইট্রোজেন হাইপোক্সিয়া ব্যবহার করে এক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও প্রথম ঘটনা।

গত বৃহস্পতিবার নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে যে আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাঁর নাম কেনেথ স্মিথ। দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল প্রায় ২২ মিনিট। নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগের পরও কয়েক মিনিট পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ছিল। দুই থেকে চার মিনিট পর্যন্ত তিনি স্ট্রেচারের ওপর গড়াগড়ি খেয়েছেন, এরপর আরও পাঁচ মিনিট ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়েছেন।

সমালোচকেরা বলছেন, অপরীক্ষিতভাবে কেনেথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।   আলাবামা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘গিনিপিগ’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সবশেষ ঘটনা দেখা গিয়েছিল ১৯৯৯ সালে। তখন হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস ব্যবহার করে এক হত্যাকারীর দণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

নাইট্রোজেন হাইপোক্সিয়া পদ্ধতিতে ওই ব্যক্তি তাঁর শ্বাসের সঙ্গে শুধু নাইট্রোজেন গ্যাস নিতে বাধ্য হন। তিনি অক্সিজেন পান না। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য অক্সিজেন জরুরি।

এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে আসামির মুখে একটি রেস্পিরেটর মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই মাস্কের মাধ্যমে আসামির ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ না করে খাঁটি নাইট্রোজেন গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

স্মিথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া দেখার জন্য পাঁচ সাংবাদিককে সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁরা কাচের দেয়ালের অপর পাশ থেকে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী ওই সাংবাদিকেরা বলেছেন, মাস্ক দিয়ে নাইট্রোজেন গ্যাসের সরবরাহ শুরুর আগে স্মিথ শেষবারের মতো কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আলাবামা কর্তৃপক্ষ মানবিকতাকে এক ধাপ পেছনে নিয়ে গেল।’

ঘটনাস্থলে স্মিথের স্ত্রী ও অন্য স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উদ্দেশে স্মিথ বলেন, ভালোবাসা, শান্তি আর জ্যোতি নিয়ে আমি পৃথিবী ছাড়ছি। তোমাদের সবার জন্য ভালোবাসা থাকল।’

মানবাধিকার আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে এমন পদ্ধতি ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি গত সপ্তাহে নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়ে স্মিথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন। একে ‘অপরীক্ষিত’ পদ্ধতি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কেনেথ স্মিথ নিজেও এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সে আবেদন খারিজ করে দেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের ৯ বিচারপতির মধ্যে ৩ জন আদালতের আদেশের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছিলেন। তাঁদেরই একজন সোনিয়া সোটোমায়র।

আদালতের আদেশে ভিন্নমত জানিয়ে তিনি এ পদ্ধতিকে ‘অপরীক্ষিত’ বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়ে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে নারী হত্যাকারী স্মিথের

এর আগে ২০২২ সালে স্মিথকে প্রথম দফায় প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর দণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।

সে প্রসঙ্গ টেনে এনে সোটোমায়র লিখেছেন, ‘প্রথম দফায় স্মিথের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আলাবামা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘গিনিপিগ’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাঁর ওপর এমন এক পদ্ধতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেটি আগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।’

স্মিথের আইনজীবীরা আদালতে আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, মাস্কটি হয়তো স্মিথের মুখে ঠিকমতো আটকাবে না। এতে নাইট্রোজেনের পাশাপাশি কিছু অক্সিজেনও ঢুকে যেতে পারে। আর তাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে এবং তাঁদের মক্কেলের কষ্ট হবে।

তবে আলাবামা কর্তৃপক্ষের দাবি, নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে ব্যথাহীন ও মানবিক মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রে এর আগে কখনো মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার না করা হলেও মাঝেমধ্যে জীবজন্তুকে মেরে ফেলার জন্য এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকান ভেটেরিনারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সুপারিশ তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের পদ্ধতিতে বড় প্রাণীর প্রাণনাশের ক্ষেত্রে একটি প্রশমনকারী ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।