০২:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

    ট্রাম্পের ধাক্কা সামলাতে ৪০ দেশের দ্বারে দ্বারে ভারত

    • Reporter Name
    • Update Time : ০১:০০:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫
    • ১০৫ Time View

    রাশিয়া থেকে তেল কেনায় ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ায় বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারত। অতিরিক্ত শুল্কের চাপে দেশটির শিল্পকারখানাগুলো কার্যত ধুঁকছে এবং শ্রমিকদের বেতন দেওয়া নিয়েও সংশয়ের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও পোশাকের বিকল্প বাজারের খুঁজছে নয়াদিল্লি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বার্তাসংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, তারা ৪০টি দেশের কাছে যাচ্ছেন ও যাবেন, যাতে তারা বেশি করে ভারতীয় বস্ত্র ও পোশাক কেনে। এই দেশগুলির মধ্যে আছে, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইটালি, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপের দেশগুলি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার দেশ। তাছাড়া আছে অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, আমিরাত, ক্যানাডা, মেক্সিকোর মতো দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে ভারত। এছাড়া রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে ও হবে। এই ৪০টি দেশে সম্মিলিতভাবে ৫৯০ বিলিয়ান মার্কিন ডলারের বাজার আছে। ভারত এই দেশগুলিকে বলবে, তাদের পোশাক ও বস্ত্রের মান খুব ভালো, টেকসই ও তার মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার ছাপ স্পষ্ট। সেজন্যই ভারতীয় পোশাক ও বস্ত্র অন্যদের থেকে আলাদা।

    আমেরিকায় ভারত গত আর্থিক বছরে এক হাজার ৮০ কোটি ডলারের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানি করেছিল। ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক বসানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই ক্ষতিপূরণের জন্যই এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই দেশের ভারতীয় দূতাবাস এবং ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনগুলি ৪০টি দেশে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বাড়াবার চেষ্টা করবে।

    ‘ঝুঁকি নিতে হবে’

    অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার, প্রসার ভারতীর সাবেক ডিরেক্টর, সাবেক সাংসদ জহর সরকার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘সরকার এখন যে চেষ্টা করছে, তাতে কিছুটা কাজ হবে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার পুরো ক্ষতিপূরণ এভাবে হবে না। আমাদের আরো কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের ভিতরে ওই পণ্যের ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে।’ জহর সরকার বলেন, ‘যেমন ধরুন, চিংড়ি রপ্তানিতে ধাক্কা লাগলে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ওড়িশা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাপান কিছুটা আমদানি বাড়তে পারে। বাকিটা আমাদের দেশের ভিতরে বাজার বাড়াতে হবে। এটা বাড়ছে না। আমাদের ফিসক্যাল পলিসির দুটো গদল আছে। ক্যাপিটালে বিনিয়োগ সরকার করছে, কিন্তু বেসরকারি সংস্থা করছে না। এটা রাতারাতি হবে না। দ্বিতীয়ত, কনসামশন কম। যাদের খরচ করার ক্ষমতা আছে, তারা করছে না। চীনও ঘরোয়া বাজার তৈরি করে সমস্যার মোকাবিলা করেছে।’ জহর সরকার মনে করেন, ‘পোশাকের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা আছে। তুলোর দাম সস্তা হলে কৃষকরা মার খাবে, কিন্তু নির্মাতাদের সুবিধা হবে। এখন দেখতে হবে, কোথায় বেশি মানুষ যুক্ত, চাষের ক্ষেত্রে নাকি কারখানা বা পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে।’ তবে তার মত হলো, ‘সংস্থাগুলিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ দিতে হবে। আমার মতে, কারগো কমপেনসেশন বা পণ্য পাঠাবার জন্য খরচটা দেওয়া যেতে পারে। আমরা আরসিইপি বা রিজিওন্যাল কমপ্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। সেখানে এখন যোগ দেওয়া উচিত। এই ঝুঁকিটা নেওয়া যেতেই পারে।’

    ‘এছাড়া কোনো উপায় নেই’

    যোজনা কমিশনের সাবেক আমলা ও লেখক অমিতাভ রায় ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, অ্যামেরিকার বাড়তি শুল্কের ধাক্কা সামলাবার জন্য ভারতকে অন্য দেশে বাজার খুঁজতে হবে এবং দেশের বাজারকেও আরো চঙ্গা করতে হবে।’তার মতে, ‘ভারত যে ৪০টি দেশ বেছে নিয়ে সেখানে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এটা ঠিক পদক্ষেপ। তবে সমস্যা হলো, ইউরোপের দেশগুলি থেকে শুরু অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডার মতো দেশের জনসংখ্যা ও চাহিদা তুলনায় কম। রাশিয়ার কাছে এখন অর্থ নেই। চীন নিজের দেশের বাইরে ভিয়েতনাম থেকে সস্তায় পোশাক ও বস্ত্র কেনে। তারা যদি এরপরও ভারত থেকে পোশাক ও বস্ত্র কিনতে রাজি হয় তাহলে ভালো কথা। সেজন্যই আমাদের নিজের দেশের ভিতরে বাজার বাড়াতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘যে পোশাকটা আমেরিকায় এক হাজার টাকা দামে বিক্রি করা হয়, সেটা বানাতে হয়ত একশ টাকা লাগে। এখন সামান্য লাভ রেখে তা দেশে বিক্রির ব্যবস্থা করুক উৎপাদনকারীরা। তাতে তাদের লাভের পরিমাণ হয়তো কম হবে, কিন্তু পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরাও বাঁচবেন।’

    ×
    15 December 2025 14:56


    Tag :

    Write Your Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Save Your Email and Others Information

    About Author Information

    ট্রাম্পের ধাক্কা সামলাতে ৪০ দেশের দ্বারে দ্বারে ভারত

    Update Time : ০১:০০:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

    রাশিয়া থেকে তেল কেনায় ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ায় বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারত। অতিরিক্ত শুল্কের চাপে দেশটির শিল্পকারখানাগুলো কার্যত ধুঁকছে এবং শ্রমিকদের বেতন দেওয়া নিয়েও সংশয়ের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও পোশাকের বিকল্প বাজারের খুঁজছে নয়াদিল্লি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বার্তাসংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, তারা ৪০টি দেশের কাছে যাচ্ছেন ও যাবেন, যাতে তারা বেশি করে ভারতীয় বস্ত্র ও পোশাক কেনে। এই দেশগুলির মধ্যে আছে, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইটালি, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপের দেশগুলি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার দেশ। তাছাড়া আছে অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, আমিরাত, ক্যানাডা, মেক্সিকোর মতো দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে ভারত। এছাড়া রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে ও হবে। এই ৪০টি দেশে সম্মিলিতভাবে ৫৯০ বিলিয়ান মার্কিন ডলারের বাজার আছে। ভারত এই দেশগুলিকে বলবে, তাদের পোশাক ও বস্ত্রের মান খুব ভালো, টেকসই ও তার মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার ছাপ স্পষ্ট। সেজন্যই ভারতীয় পোশাক ও বস্ত্র অন্যদের থেকে আলাদা।

    আমেরিকায় ভারত গত আর্থিক বছরে এক হাজার ৮০ কোটি ডলারের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানি করেছিল। ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক বসানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই ক্ষতিপূরণের জন্যই এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই দেশের ভারতীয় দূতাবাস এবং ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনগুলি ৪০টি দেশে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বাড়াবার চেষ্টা করবে।

    ‘ঝুঁকি নিতে হবে’

    অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার, প্রসার ভারতীর সাবেক ডিরেক্টর, সাবেক সাংসদ জহর সরকার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘সরকার এখন যে চেষ্টা করছে, তাতে কিছুটা কাজ হবে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার পুরো ক্ষতিপূরণ এভাবে হবে না। আমাদের আরো কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের ভিতরে ওই পণ্যের ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে।’ জহর সরকার বলেন, ‘যেমন ধরুন, চিংড়ি রপ্তানিতে ধাক্কা লাগলে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ওড়িশা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাপান কিছুটা আমদানি বাড়তে পারে। বাকিটা আমাদের দেশের ভিতরে বাজার বাড়াতে হবে। এটা বাড়ছে না। আমাদের ফিসক্যাল পলিসির দুটো গদল আছে। ক্যাপিটালে বিনিয়োগ সরকার করছে, কিন্তু বেসরকারি সংস্থা করছে না। এটা রাতারাতি হবে না। দ্বিতীয়ত, কনসামশন কম। যাদের খরচ করার ক্ষমতা আছে, তারা করছে না। চীনও ঘরোয়া বাজার তৈরি করে সমস্যার মোকাবিলা করেছে।’ জহর সরকার মনে করেন, ‘পোশাকের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা আছে। তুলোর দাম সস্তা হলে কৃষকরা মার খাবে, কিন্তু নির্মাতাদের সুবিধা হবে। এখন দেখতে হবে, কোথায় বেশি মানুষ যুক্ত, চাষের ক্ষেত্রে নাকি কারখানা বা পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে।’ তবে তার মত হলো, ‘সংস্থাগুলিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ দিতে হবে। আমার মতে, কারগো কমপেনসেশন বা পণ্য পাঠাবার জন্য খরচটা দেওয়া যেতে পারে। আমরা আরসিইপি বা রিজিওন্যাল কমপ্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। সেখানে এখন যোগ দেওয়া উচিত। এই ঝুঁকিটা নেওয়া যেতেই পারে।’

    ‘এছাড়া কোনো উপায় নেই’

    যোজনা কমিশনের সাবেক আমলা ও লেখক অমিতাভ রায় ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, অ্যামেরিকার বাড়তি শুল্কের ধাক্কা সামলাবার জন্য ভারতকে অন্য দেশে বাজার খুঁজতে হবে এবং দেশের বাজারকেও আরো চঙ্গা করতে হবে।’তার মতে, ‘ভারত যে ৪০টি দেশ বেছে নিয়ে সেখানে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এটা ঠিক পদক্ষেপ। তবে সমস্যা হলো, ইউরোপের দেশগুলি থেকে শুরু অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডার মতো দেশের জনসংখ্যা ও চাহিদা তুলনায় কম। রাশিয়ার কাছে এখন অর্থ নেই। চীন নিজের দেশের বাইরে ভিয়েতনাম থেকে সস্তায় পোশাক ও বস্ত্র কেনে। তারা যদি এরপরও ভারত থেকে পোশাক ও বস্ত্র কিনতে রাজি হয় তাহলে ভালো কথা। সেজন্যই আমাদের নিজের দেশের ভিতরে বাজার বাড়াতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘যে পোশাকটা আমেরিকায় এক হাজার টাকা দামে বিক্রি করা হয়, সেটা বানাতে হয়ত একশ টাকা লাগে। এখন সামান্য লাভ রেখে তা দেশে বিক্রির ব্যবস্থা করুক উৎপাদনকারীরা। তাতে তাদের লাভের পরিমাণ হয়তো কম হবে, কিন্তু পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরাও বাঁচবেন।’

    ×
    15 December 2025 14:56