
আমার ছোট্ট বাবাটার শরীর পুড়ে গেছে, মুখ, হাত-পা ঝলসে গেছে, মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ও আল্লাহ আমার বাবাটার সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও। আমার বাচ্চাকে একটু শান্তি দাও। সকালে আমি এক টেবিলে বসে খাওয়াইলাম। এখন হাসপাতালে ভর্তি। কী থেকে কী হয়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল। এভাবেই হাউমাউ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের সামনে বসে বিলাপ করছিলেন বাবা মো. মহসিন হোসেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তার সপ্তম শ্রেণিতেপড়ুয়া ছেলে মাতিন হোসেনের জন্য কাঁদছিলেন। হাসপাতালের ৫২০ নম্বর কক্ষের মেঝেতে মেয়েকে ধরে হাউমাউ করে বিলাপ করছিলেন মা ইয়াসমিন আক্তার। তার ১১ বছর বয়সি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে নুরে জান্নাত ইউশার পিঠও পুড়ে গেছে। তিনি সময়ের আলোকে জানান, আমার মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। মেয়ে বলেছে মা শরীরের জ্বালাপোড়া সহ্য করতে পারছি না। এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তার কান্নায় বার্ন ইউনিটের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। কোনোভাবেই তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না পরিবারের লোকজন। কান্নার একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
সোমবার দুপুরের পর থেকেই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের আনা হয় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে আসছে দগ্ধরা। তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদের ভিড় আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বার্ন ইনস্টিটিউটের মূল চত্বর। স্বজনদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা আহতদের হাসপাতালে দেখতে আসায় বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয় চিকিৎসক-নার্সদের। এই নিয়ে রোগীদের স্বজনদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সরেজমিন দেখা গেছে, কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে আসছেন পরিবার-পরিজন। যেখানে বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধদের ভর্তি করা হয়েছে। তাদের কারও সন্তান মারা গেছে আবার কারও সন্তানের শরীর থেকে ৭০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে, আবার কারও ৪০, ৩০, ২০ এবং ১০ শতাংশ কম-বেশি দগ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর থেকে কারও কারও সন্তানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে প্রিয় সন্তানদের খোঁজে বার্ন ইউনিটে ছুটে আসছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সন্তানের খোঁজে আসেন, কেউ আসেন ছোটভাই, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগনে-ভাগনির খোঁজে। তাদের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কারও কারও কান্না থামানো যাচ্ছিল না। রোগী-স্বজন ছাড়াও হাসপাতালজুড়েই ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। বিশেষ করে হাসপাতালে বাইরে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। আর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক-নার্সদের।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, যারা আহত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই শিশু। তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল রোগীরা এই বার্ন ইনস্টিটিউটে আছে। অতিরিক্ত ক্রিটিক্যাল দগ্ধ রোগীদের ইনডোর ও ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেককেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগেরই শরীরের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ৭০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছে। আর আহতের মধ্যে আইসিইউতে ৯ জন ভর্তি রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি কনফারেন্স রুম ও স্টাফ ওয়ার্ডও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা গুরুতর আহত হয়েছে তারা হলোÑমাসুকা, বাপ্পী সরকার, মাহতাব, নাফিজ, শামীম, শায়ান ইউসুফ, সায়মা, মাহিয়া, আফরান এবং মাহরিন চৌধুরী । তাদের মধ্যে কারও ৮০ শতাংশের বেশি দগ্ধ, আবার কারও ৭০, ৬০, ৪০, ৩০, ২০ এবং ১০ শতাশের বেশি বা কম দগ্ধ হয়েছে।
মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ১১ বছর বয়সি আরিয়ানের সারা শরীর পুড়ে গেছে। তাকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতাল থেকে আরিয়ানকে বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেয় উন্নত চিকিৎসার জন্য।