১০:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

    মিরপুরের ভয়ঙ্কর ডন ইলিয়াস মোল্লা

    • Reporter Name
    • Update Time : ০৯:২১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
    • ৪০৪ Time View

    জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৪৭৩টি প্লটসহ মিরপুরে প্রায় ৭০০ একর সরকারি জমি দখল এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
    দুদক জানায়, এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ইলিয়াস মোল্লাহর নিজের ও পরিবারের নামে আইয়াজ প্যালেস, শ্যামপুর, বিরুলিয়া ও সাভারে কয়েকশ বিঘা সম্পদের খোঁজ মিলেছে। যার মধ্যে রয়েছে বিরুলিয়ায় ৬০ বিঘার ওপর বাগান বাড়ি এবং একই জায়গায় ছেলের নামে পৃথক একটি বাংলো বাড়ি। এছাড়া ইলিয়াসের নিজের নামে তিনটি ব্যক্তিগত গাড়ির তথ্য-প্রমাণও মিলেছে।
    অন্যদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৪৭৩টি প্লট ও প্রায় ২৬ একর জমি, মিরপুর-১ নম্বরে জাতীয় চিড়িয়াখানার নামে বরাদ্দ হওয়া প্রায় দুই একর জমি এবং মিরপুর-২ নম্বরে তুরাগ নদের অংশ ভরাট করে দুই শতাধিক বস্তিঘর গড়ে তোলার অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে।
    এতো দিন মিরপুরের ভয়ঙ্কর ডনের বিরুদ্ধে কেউ কথা না বললেও, স্থানীয় অনেকই জানান, ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের বড় একটি উৎস হলো দুয়ারীপাড়া। ১৯৮১ সালে মিরপুর সাড়ে ১১ সংলগ্ন দুয়ারীপাড়ার ৪৭৩টি প্লট জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ দেয়। এসব প্লটের আয়তন পৌনে দুই, আড়াই ও তিন কাঠা। ওই জমি ওয়াক্ফ এস্টেটের বলে দাবি করলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ওই জমি ইলিয়াস মোল্লাহ দখলে নেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে এসব জমি নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। জমি থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বছরে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেওয়া হতো। এ ছাড়া সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিল বাবদ ও ভাড়ার নামে টাকা তুলতেন তিনি।
    দুদকের অভিযোগ বলছে, ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে ওই জায়গায় ৪৭৩টি প্লট ছিল। এসব প্লটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ছিল সাত হাজারের বেশি। যত প্লট বাড়ানো হবে তত টাকা এ ধারণায় ৪৭৩টি প্লটকে ভেঙে সাত শতাধিক প্লট বানানো হয়। প্লটগুলো যাদের দখলে ছিল তারা ইলিয়াস মোল্লাহর কাছে জিম্মি ছিলেন। এসব প্লট থেকে চারবার উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে প্রতিবারই প্লট প্রতি দুই থেকে চার লাখ করে মোট অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইলিয়াস মোল্লাহ। এ ছাড়া এলাকার মার্কেট, ছোট দোকান, ফুটপাতের দোকান থেকেও তার অনুগতরা নিয়মিত টাকা তুলতেন। সেই টাকা সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হতো না।
    রূপনগর, দুয়ারীপাড়া, মিরপুর-১০, পলাশনগর, মানিকদি, ইস্টার্ন হাউজিং, আরামবাগ, মিরপুর-৬, ৭ ও বাউনিয়ার সব পাড়া-মহল্লার ফুটপাত ও রাস্তার ওপর বসানো অস্থায়ী দোকানের ভাড়া ইলিয়াস মোল্লাহর অনুগতদের দিতে হতো। প্রতিটি অস্থায়ী দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এসব কাজে পাড়া-মহল্লা ছয় থেকে সাতজনের গ্রুপ কাজ করত। রূপনগর টিনশেড কলোনি নামে পরিচিত এলাকাটিও ছিল ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের আরেক উৎস।
    এখানেই শেষ নয়, শেখ হাসিনার মতো নির্বাচনি হলফ নামাতেও তথ্য গোপন ও ভুল তথ্য দেয়ার প্রশান মিলেছে ইলিয়াস মোল্লার বিরুদ্ধে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থসহ মোট ৬ কোটি ৭ লাখ ১০ হাজার ৬০০ টাকা দেখিয়েছেন আয়কর নথিতে। রিটার্নে মোট তিনটি গাড়ির কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তার হলফনামায় মোট বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের হলফনামায় তার আয় দেখানো হয় ৩ কোটি ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ব্যবসা হিসেবে মাছ চাষ দেখানো হয়েছিল। এরপর দেখানো হয় একটি অ্যাগ্রো ফার্ম, একটি মৎস্য খামার ও একটি বিপণিবিতান। এ ছাড়া দেখানো হয় দুটি বাড়ি ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট। ইলিয়াস মোল্লাহর নামে ৬০ ভরি ও স্ত্রীর নামে ৩২ ভরি সোনা দেখানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা এ সম্পদের হিসাবকে হাস্যকর উল্লেখ করে বলেছেন, তার এ সম্পদের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।
    দুদকের অনুসন্ধানেও ইলিয়াস মোল্লাহর নিজ ও পরিবারের নামে সাভারে আইয়াজ প্যালেস, শ্যামপুর, বিরুলিয়া ও সাভার কয়েকশত বিঘার সম্পদের খোঁজ মিলেছে। যার মধ্যে রয়েছে বিরুলিয়ায় ৬০ বিঘা জায়গার ওপর বাগান বাড়ি ও ছেলের নামে পৃথক একটি বাংলো বাড়ির তথ্য-প্রমাণ মিলেছে।
    ইলিয়াস মোল্লাহ ২০০৫ সালের দিকে পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তিনি পল্লবী এলাকায় মাছের ঘেরের ব্যবসা করতেন। আসন পুনর্বিন্যাস হলে তিনি ঢাকা-১৬ আসনে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হন।

    ×
    3 February 2026 22:22


    Tag :

    Write Your Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Save Your Email and Others Information

    About Author Information

    Jakir Patwary

    জনপ্রিয় পোস্ট

    সিসিকের পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক ফারুকের যত সম্পদ

    মিরপুরের ভয়ঙ্কর ডন ইলিয়াস মোল্লা

    Update Time : ০৯:২১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

    জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৪৭৩টি প্লটসহ মিরপুরে প্রায় ৭০০ একর সরকারি জমি দখল এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
    দুদক জানায়, এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ইলিয়াস মোল্লাহর নিজের ও পরিবারের নামে আইয়াজ প্যালেস, শ্যামপুর, বিরুলিয়া ও সাভারে কয়েকশ বিঘা সম্পদের খোঁজ মিলেছে। যার মধ্যে রয়েছে বিরুলিয়ায় ৬০ বিঘার ওপর বাগান বাড়ি এবং একই জায়গায় ছেলের নামে পৃথক একটি বাংলো বাড়ি। এছাড়া ইলিয়াসের নিজের নামে তিনটি ব্যক্তিগত গাড়ির তথ্য-প্রমাণও মিলেছে।
    অন্যদিকে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৪৭৩টি প্লট ও প্রায় ২৬ একর জমি, মিরপুর-১ নম্বরে জাতীয় চিড়িয়াখানার নামে বরাদ্দ হওয়া প্রায় দুই একর জমি এবং মিরপুর-২ নম্বরে তুরাগ নদের অংশ ভরাট করে দুই শতাধিক বস্তিঘর গড়ে তোলার অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে।
    এতো দিন মিরপুরের ভয়ঙ্কর ডনের বিরুদ্ধে কেউ কথা না বললেও, স্থানীয় অনেকই জানান, ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের বড় একটি উৎস হলো দুয়ারীপাড়া। ১৯৮১ সালে মিরপুর সাড়ে ১১ সংলগ্ন দুয়ারীপাড়ার ৪৭৩টি প্লট জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ দেয়। এসব প্লটের আয়তন পৌনে দুই, আড়াই ও তিন কাঠা। ওই জমি ওয়াক্ফ এস্টেটের বলে দাবি করলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ওই জমি ইলিয়াস মোল্লাহ দখলে নেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে এসব জমি নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। জমি থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বছরে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেওয়া হতো। এ ছাড়া সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিল বাবদ ও ভাড়ার নামে টাকা তুলতেন তিনি।
    দুদকের অভিযোগ বলছে, ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে ওই জায়গায় ৪৭৩টি প্লট ছিল। এসব প্লটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ছিল সাত হাজারের বেশি। যত প্লট বাড়ানো হবে তত টাকা এ ধারণায় ৪৭৩টি প্লটকে ভেঙে সাত শতাধিক প্লট বানানো হয়। প্লটগুলো যাদের দখলে ছিল তারা ইলিয়াস মোল্লাহর কাছে জিম্মি ছিলেন। এসব প্লট থেকে চারবার উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে প্রতিবারই প্লট প্রতি দুই থেকে চার লাখ করে মোট অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইলিয়াস মোল্লাহ। এ ছাড়া এলাকার মার্কেট, ছোট দোকান, ফুটপাতের দোকান থেকেও তার অনুগতরা নিয়মিত টাকা তুলতেন। সেই টাকা সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হতো না।
    রূপনগর, দুয়ারীপাড়া, মিরপুর-১০, পলাশনগর, মানিকদি, ইস্টার্ন হাউজিং, আরামবাগ, মিরপুর-৬, ৭ ও বাউনিয়ার সব পাড়া-মহল্লার ফুটপাত ও রাস্তার ওপর বসানো অস্থায়ী দোকানের ভাড়া ইলিয়াস মোল্লাহর অনুগতদের দিতে হতো। প্রতিটি অস্থায়ী দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এসব কাজে পাড়া-মহল্লা ছয় থেকে সাতজনের গ্রুপ কাজ করত। রূপনগর টিনশেড কলোনি নামে পরিচিত এলাকাটিও ছিল ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের আরেক উৎস।
    এখানেই শেষ নয়, শেখ হাসিনার মতো নির্বাচনি হলফ নামাতেও তথ্য গোপন ও ভুল তথ্য দেয়ার প্রশান মিলেছে ইলিয়াস মোল্লার বিরুদ্ধে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থসহ মোট ৬ কোটি ৭ লাখ ১০ হাজার ৬০০ টাকা দেখিয়েছেন আয়কর নথিতে। রিটার্নে মোট তিনটি গাড়ির কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তার হলফনামায় মোট বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের হলফনামায় তার আয় দেখানো হয় ৩ কোটি ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ব্যবসা হিসেবে মাছ চাষ দেখানো হয়েছিল। এরপর দেখানো হয় একটি অ্যাগ্রো ফার্ম, একটি মৎস্য খামার ও একটি বিপণিবিতান। এ ছাড়া দেখানো হয় দুটি বাড়ি ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট। ইলিয়াস মোল্লাহর নামে ৬০ ভরি ও স্ত্রীর নামে ৩২ ভরি সোনা দেখানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা এ সম্পদের হিসাবকে হাস্যকর উল্লেখ করে বলেছেন, তার এ সম্পদের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।
    দুদকের অনুসন্ধানেও ইলিয়াস মোল্লাহর নিজ ও পরিবারের নামে সাভারে আইয়াজ প্যালেস, শ্যামপুর, বিরুলিয়া ও সাভার কয়েকশত বিঘার সম্পদের খোঁজ মিলেছে। যার মধ্যে রয়েছে বিরুলিয়ায় ৬০ বিঘা জায়গার ওপর বাগান বাড়ি ও ছেলের নামে পৃথক একটি বাংলো বাড়ির তথ্য-প্রমাণ মিলেছে।
    ইলিয়াস মোল্লাহ ২০০৫ সালের দিকে পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তিনি পল্লবী এলাকায় মাছের ঘেরের ব্যবসা করতেন। আসন পুনর্বিন্যাস হলে তিনি ঢাকা-১৬ আসনে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হন।

    ×
    3 February 2026 22:22