০৩:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

    সিলেট ৩ আসনে এমএ মালিক প্রার্থিতায় বিস্মিত নেতাকর্মীরা, নিস্থব্দ তিন উপজেলা

    • Reporter Name
    • Update Time : ১১:০৭:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
    • ৪১৪ Time View

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ৬ সংসদীয় আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪টিতে নিজেদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে সিলেট ৩ আসনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিককে প্রার্থী করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সকল দলের কছে সিলেট ১ আসন অতিব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিএনপির কাছে সিলেট ৩ আসনটি সিলেটের সকল আসনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুর বাড়ির আসন খ্যাত সিলেট-৩ আসন একটি ঐতিহ্যবাহী সংসদীয় এলাকা। সিলেট শহরতলীর দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা ও সিটি করেপারেশনের ৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনের জগণের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি একজন ক্লীন ইমেজধারী, স্বচ্ছ, নিষ্টা ও নৈতিকতা সম্পন্ন ও জনসম্পৃক্ত ব্যাক্তিকে দলীয় প্রার্থী ঘোষনা করবে। কিন্তু বিএনপি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে ইমেজ সংকটে ভুগছেন এমন একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে, এম এ মালিককে দলীয় প্রার্থী ঘোষনা করার পর বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। আসটিতে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ সমর্থকরা মিষ্টি বিতরণ করছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এম এ মালিক প্রার্থী হওয়ায় আসনটিতে তাদের বিজয় প্রায় সুনিশ্চিত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট জেলার ৪টি আসনে দলের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষনা করার পর সিলেট ১, সিলেট ২ ও সিলেট ৬ আসনের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। এসব আসনের অন্যান্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরাও নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ব্যাতিক্রম শুধুমাত্র সিলেট ৩ আসন। দলীয় প্রার্থী ঘোষনার পর সর্বত্র যেন হাহাকার। হাট-বাজার থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লায় বিএনপির প্রার্থীতা নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা। সর্বত্র যেন সুনসান নীরবতা। প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি কি তবে আগামীর নতুন বাংরাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেখছে সেটি পূরণ করতে পারবে?

    আসনটিতে দলীয় প্রার্থী ঘোষনার পর তিনটি উপজেলায় নিস্থব্দতা বিরাজ করছে। দলটির তৃণমূলের কর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আসনটিতে অপর দুই শক্তিশালী প্রার্থী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্ঠা ব্যারিষ্টার এমএ সালাম ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সহ অন্যান্য প্রার্থীরা তাদের কর্মী সমর্থকদের কিছুতেই মালিকের পক্ষে মাঠে নামাতে পারছেন না। এদিকে, যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে দলের নেতাকর্মীরা হাই কমান্ডের নির্দেশনার কারনে নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। পদবীধারী কোন নেতা কিংবা মাঠের কোন কর্মীকেই মনোনীত প্রার্থীকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়নি। এমনকি তিন উপজেলার সাধারণ মানুষও বলাবলি করছেন, বিএনপি কি তবে ভুল পথে হাটছে? না কি জামায়াতে ইসলামির বিজয় নিশ্চিত করতে এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে? এমন আলোচনাও এখন সর্বত্র চলছে।

    দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, আমরা এই প্রার্থীকে নিয়ে কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে যাব। তিনি দলের ত্যাগী নেতা সবকিছু ঠিক আছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও নারী ক্যালেঙ্কারীর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় দলের চেয়ারপার্সন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়তো বা জানেন না। তাছাড়াও এই তিন উপজেলার বাসিন্ধাদের সাথে তার নূন্যতম কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে ফিরে আওয়ামীলীগের দোসরদেরকে নিয়ে সভা সমাবেশে করেছেন। যারা বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে হয়রানী করেছে, মামলা দিয়েছে, হামলা করেছে তারা মালেকের চার পাশে রয়েছে। আমরা এই প্রার্থীকে নিয়ে কোন ভাবেই মাঠে কাজ করতে পারব না। দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, যুবদলের অন্তত ১৩ জন দায়িত্বশীল শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি এবার একজন জনবান্ধব যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যাক্তিকে সিলেট-৩ আসনে মনোয়ন দেবে। যিনি মাঠের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি গিয়েছেন, যিনি তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফ বুঝেন এবং এই ৩১ দফা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম যার সাথে নেতাকর্মীদের ন্যুনতম কোন সম্পর্ক নেই, যিনি বিভিন্ন উপজেলায় ভাড়াটিয়া-কোম্পানির লোক এনে মিছিল সমাবেশ করেছেন, যিনি ৩১ দফা ভালোভাবে বুঝেননা তাকেই দল মনোনয়ন দিলো।

    তারা বলেন, দলের সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে চুড়ান্ত। তবে যাকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে তাকে নিয়ে মাঠে কাজ করা সম্ভব নয়। এই আসনের সিংহভাগ ভোটার নারী। আর যার বিরুদ্ধে নারী ক্যালেঙ্কারীর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাকে নিয়ে নারীদের ভোট টানা সম্ভব নয়। এতে করে নারীদের ভোট বিরোধী শিবিরে চলে যাবে, আমাদের আসন হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হতাশা প্রকাশ করে জনৈক যুবদল নেতা বলেন, কিছু বললে তো বহিষ্কার হয়ে যাব। তবে দল কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল এখনো বুঝে আসছেনা। এমন একজনকে মনোনয়ন দিল যাকে সাধারণ মানুষ চিনেনা। যিনি মারাত্মকভাবে ইমেজ সংকটে ভুগছেন। যার সাথে মানুষের কোন সম্পর্ক নেই। তাকে নিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করা বহু কঠিন হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই তিন উপজেলার ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা বলেন, আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটের প্রভাব বেশী। তরুণরা সুশিক্ষিত ও মার্জিত ব্যাক্তিকে সংসদ সদস্য হিসেবে পছন্দ করে থাকেন। যাকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে উনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাছাড়া কথাবার্তাও উগ্র। তাই এই প্রার্থীর পক্ষে তরুণদের ভোট টানা সম্ভব হবে না।

    এই তিন উপজেলার বিএনপি সমর্থিত বেশ কয়েকজন নারী বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধির কাছে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব নারী জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, দেশের সিংহ ভাগ ভোটার নারী, আমাদের আসনেও নারী ভোটার বেশী। আমরা মা-বোনদের কাছে এমন ব্যক্তি পক্ষে কোন মুখে ভোট চাইব। রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন সিলেট ৩ আসনের ভোটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেন, সিলেট-৩ আসনে আমরা অন্তত দেড় লাখ তরুণ ভোটার রয়েছি। আমরা জেন-জি’রা বিএনপির প্রার্থী এম এ মালেককে কখনো মাঠে-ঘাটে দেখিনি। দেখেছি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অনুষ্টানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এম এ মালেককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্তত নোংরা ভাষা ব্যবহার করতে দেখেছি। যিনি নারীদের সরাসরি কটাক্ষ করে নোংরা ভাষায় কথা বলেন। তাকে অনেকটা মাতাল টাইপের মনে হয়। এই লোক নির্বাচনে প্রার্থী হলে নিশ্চিত ভরাডুবি। এছাড়া এম এ মালেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জনের নিকট থেকে চাঁদাবাজি, লন্ডনে তারেক রহমানের সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার নামে টাকা আত্বসাৎসহ আর্থিক কেলেংকারীর অভিযোগ রয়েছে। তাই এই ব্যাক্তির হাতে ধানের শীষ দিলে বিএনপির মারাত্মক ভরাডুবি হবে বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ।

    এছাড়া মালেককে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর পরই জামায়াতে ইসলামি মনোনীত প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ‘যাক, বিজয় তাহলে সহজ হলো’। তাই এম এ মালেককে মনোনয়ন দেয়া মানে মাওলানা লোকমানের বিজয় নিশ্চিত করা বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির পর মালিক অনুসারীরা উচ্ছাস প্রকাশ করলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় এম এ মালিক তুলনামূলকভাবে জনবিচ্ছিন্ন। তাঁর প্রার্থিতায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে এটা মেনে নিতে পারছেন না। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনাও চলছে। তবে দলের উচ্চপর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ থাকায় অনেকে সাংগঠনিক শাস্তির ভয়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না।

    উল্লেখ্য, সিলেট-৩ আসনে প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে স্থানীয় রাজনীতিতে তৎপর হন

    ×
    16 December 2025 03:42


    Tag :

    Write Your Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Save Your Email and Others Information

    About Author Information

    সিলেট ৩ আসনে এমএ মালিক প্রার্থিতায় বিস্মিত নেতাকর্মীরা, নিস্থব্দ তিন উপজেলা

    Update Time : ১১:০৭:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ৬ সংসদীয় আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪টিতে নিজেদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে সিলেট ৩ আসনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিককে প্রার্থী করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সকল দলের কছে সিলেট ১ আসন অতিব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিএনপির কাছে সিলেট ৩ আসনটি সিলেটের সকল আসনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুর বাড়ির আসন খ্যাত সিলেট-৩ আসন একটি ঐতিহ্যবাহী সংসদীয় এলাকা। সিলেট শহরতলীর দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা ও সিটি করেপারেশনের ৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনের জগণের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি একজন ক্লীন ইমেজধারী, স্বচ্ছ, নিষ্টা ও নৈতিকতা সম্পন্ন ও জনসম্পৃক্ত ব্যাক্তিকে দলীয় প্রার্থী ঘোষনা করবে। কিন্তু বিএনপি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে ইমেজ সংকটে ভুগছেন এমন একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে, এম এ মালিককে দলীয় প্রার্থী ঘোষনা করার পর বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। আসটিতে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ সমর্থকরা মিষ্টি বিতরণ করছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এম এ মালিক প্রার্থী হওয়ায় আসনটিতে তাদের বিজয় প্রায় সুনিশ্চিত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট জেলার ৪টি আসনে দলের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষনা করার পর সিলেট ১, সিলেট ২ ও সিলেট ৬ আসনের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। এসব আসনের অন্যান্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরাও নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ব্যাতিক্রম শুধুমাত্র সিলেট ৩ আসন। দলীয় প্রার্থী ঘোষনার পর সর্বত্র যেন হাহাকার। হাট-বাজার থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লায় বিএনপির প্রার্থীতা নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা। সর্বত্র যেন সুনসান নীরবতা। প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি কি তবে আগামীর নতুন বাংরাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেখছে সেটি পূরণ করতে পারবে?

    আসনটিতে দলীয় প্রার্থী ঘোষনার পর তিনটি উপজেলায় নিস্থব্দতা বিরাজ করছে। দলটির তৃণমূলের কর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আসনটিতে অপর দুই শক্তিশালী প্রার্থী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্ঠা ব্যারিষ্টার এমএ সালাম ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সহ অন্যান্য প্রার্থীরা তাদের কর্মী সমর্থকদের কিছুতেই মালিকের পক্ষে মাঠে নামাতে পারছেন না। এদিকে, যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে দলের নেতাকর্মীরা হাই কমান্ডের নির্দেশনার কারনে নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। পদবীধারী কোন নেতা কিংবা মাঠের কোন কর্মীকেই মনোনীত প্রার্থীকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়নি। এমনকি তিন উপজেলার সাধারণ মানুষও বলাবলি করছেন, বিএনপি কি তবে ভুল পথে হাটছে? না কি জামায়াতে ইসলামির বিজয় নিশ্চিত করতে এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে? এমন আলোচনাও এখন সর্বত্র চলছে।

    দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, আমরা এই প্রার্থীকে নিয়ে কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে যাব। তিনি দলের ত্যাগী নেতা সবকিছু ঠিক আছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও নারী ক্যালেঙ্কারীর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় দলের চেয়ারপার্সন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়তো বা জানেন না। তাছাড়াও এই তিন উপজেলার বাসিন্ধাদের সাথে তার নূন্যতম কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে ফিরে আওয়ামীলীগের দোসরদেরকে নিয়ে সভা সমাবেশে করেছেন। যারা বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে হয়রানী করেছে, মামলা দিয়েছে, হামলা করেছে তারা মালেকের চার পাশে রয়েছে। আমরা এই প্রার্থীকে নিয়ে কোন ভাবেই মাঠে কাজ করতে পারব না। দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, যুবদলের অন্তত ১৩ জন দায়িত্বশীল শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি এবার একজন জনবান্ধব যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যাক্তিকে সিলেট-৩ আসনে মনোয়ন দেবে। যিনি মাঠের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি গিয়েছেন, যিনি তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফ বুঝেন এবং এই ৩১ দফা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম যার সাথে নেতাকর্মীদের ন্যুনতম কোন সম্পর্ক নেই, যিনি বিভিন্ন উপজেলায় ভাড়াটিয়া-কোম্পানির লোক এনে মিছিল সমাবেশ করেছেন, যিনি ৩১ দফা ভালোভাবে বুঝেননা তাকেই দল মনোনয়ন দিলো।

    তারা বলেন, দলের সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে চুড়ান্ত। তবে যাকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে তাকে নিয়ে মাঠে কাজ করা সম্ভব নয়। এই আসনের সিংহভাগ ভোটার নারী। আর যার বিরুদ্ধে নারী ক্যালেঙ্কারীর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাকে নিয়ে নারীদের ভোট টানা সম্ভব নয়। এতে করে নারীদের ভোট বিরোধী শিবিরে চলে যাবে, আমাদের আসন হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হতাশা প্রকাশ করে জনৈক যুবদল নেতা বলেন, কিছু বললে তো বহিষ্কার হয়ে যাব। তবে দল কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল এখনো বুঝে আসছেনা। এমন একজনকে মনোনয়ন দিল যাকে সাধারণ মানুষ চিনেনা। যিনি মারাত্মকভাবে ইমেজ সংকটে ভুগছেন। যার সাথে মানুষের কোন সম্পর্ক নেই। তাকে নিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করা বহু কঠিন হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই তিন উপজেলার ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা বলেন, আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটের প্রভাব বেশী। তরুণরা সুশিক্ষিত ও মার্জিত ব্যাক্তিকে সংসদ সদস্য হিসেবে পছন্দ করে থাকেন। যাকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে উনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাছাড়া কথাবার্তাও উগ্র। তাই এই প্রার্থীর পক্ষে তরুণদের ভোট টানা সম্ভব হবে না।

    এই তিন উপজেলার বিএনপি সমর্থিত বেশ কয়েকজন নারী বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধির কাছে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব নারী জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, দেশের সিংহ ভাগ ভোটার নারী, আমাদের আসনেও নারী ভোটার বেশী। আমরা মা-বোনদের কাছে এমন ব্যক্তি পক্ষে কোন মুখে ভোট চাইব। রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন সিলেট ৩ আসনের ভোটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেন, সিলেট-৩ আসনে আমরা অন্তত দেড় লাখ তরুণ ভোটার রয়েছি। আমরা জেন-জি’রা বিএনপির প্রার্থী এম এ মালেককে কখনো মাঠে-ঘাটে দেখিনি। দেখেছি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অনুষ্টানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এম এ মালেককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্তত নোংরা ভাষা ব্যবহার করতে দেখেছি। যিনি নারীদের সরাসরি কটাক্ষ করে নোংরা ভাষায় কথা বলেন। তাকে অনেকটা মাতাল টাইপের মনে হয়। এই লোক নির্বাচনে প্রার্থী হলে নিশ্চিত ভরাডুবি। এছাড়া এম এ মালেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জনের নিকট থেকে চাঁদাবাজি, লন্ডনে তারেক রহমানের সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার নামে টাকা আত্বসাৎসহ আর্থিক কেলেংকারীর অভিযোগ রয়েছে। তাই এই ব্যাক্তির হাতে ধানের শীষ দিলে বিএনপির মারাত্মক ভরাডুবি হবে বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ।

    এছাড়া মালেককে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর পরই জামায়াতে ইসলামি মনোনীত প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ‘যাক, বিজয় তাহলে সহজ হলো’। তাই এম এ মালেককে মনোনয়ন দেয়া মানে মাওলানা লোকমানের বিজয় নিশ্চিত করা বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির পর মালিক অনুসারীরা উচ্ছাস প্রকাশ করলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় এম এ মালিক তুলনামূলকভাবে জনবিচ্ছিন্ন। তাঁর প্রার্থিতায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে এটা মেনে নিতে পারছেন না। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনাও চলছে। তবে দলের উচ্চপর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ থাকায় অনেকে সাংগঠনিক শাস্তির ভয়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না।

    উল্লেখ্য, সিলেট-৩ আসনে প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে স্থানীয় রাজনীতিতে তৎপর হন

    ×
    16 December 2025 03:42